স্করসেজির ভাষাতেই যদি শুরু করি, তাহলে বলতে হয়- যতদূর মনে করতে পারি, আমি সবসময়ই মার্টিন স্কোরসেজিরফ্যান ছিলাম। আমার কাছে তার একটা ফিল্ম দেখা মানে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ভাষণের চেয়েও বড় কিছু। কেন জানেন? কারণ রাষ্ট্রপতি যে গল্পটা বলেন না, স্কোরসেজি ঠিক সেই গল্পটাই বলেন। কোন গল্প? সেটা হলো 'আমেরিকান ড্রিম' বা সফল হওয়ার সেই রঙিন স্বপ্নটা কীভাবে মরে গেছে এবং খোদ আমেরিকা নিজেই একে কীভাবে খুন করেছে। স্কোরসেজি কেন এত দরকারি? কারণ তিনি কেবল একজন গুণী পরিচালক নন, বরং রাষ্ট্র যখন আমেরিকান ড্রিমের ব্যর্থতা নিয়ে চুপ থাকে, তখন তিনি সেই নীরবতা ভাঙেন। স্কোরসেজি কেবল একজন সেরাদের সেরা ফিল্মমেকারই নন, তাকে একজন 'লাশ কাটা ঘরের ডাক্তার' বা প্যাথলজিস্টও বলা যায়। যিনি সরকার আর পুঁজিবাদী ব্যবস্থার তৈরি করা 'জাতীয় রূপকথা'র ওপর খুব নিখুঁতভাবে ময়নাতদন্ত করছেন। আন্তোনিও গ্রামশি যেমন প্রিজন নোটবুকসে লিখেছিলেন, "পুরানো দুনিয়া মরছে, আর নতুন দুনিয়া জন্ম নিতে হিমশিম খাচ্ছে; এর মাঝে এখন হলো দানবদের সময়।" এই কথাটা আমেরিকার জন্য একদম সত্যি। কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্র মানুষকে শিখিয়েছে যে কঠোর পরিশ্রম আর আইন মেনে চললে সুন্দর জীবন পাওয়া যায়। কিন্তু স্কোরসেজি দেখিয়েছেন যে এই বড় বড় আদর্শ বা 'গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ' আসলে অচল হয়ে গেছে। আর এর সবচেয়ে সেরা উদাহরণ হলো 'গুডফেলাস' (১৯৯০) ফিল্মটা। এই সমাজে ভালো মানুষ হয়ে থাকার নিয়মকে হেনরি হিল যেভাবে লাথি মেরে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেটা আসলে একটা পচে যাওয়া সিস্টেমের প্রতি যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া। সেই হিসেবে 'গুডফেলাস' হলো উত্তর-আধুনিক বা পোস্টমডার্ন যুগের এক দলিল, যা আমেরিকান ড্রিমের পতনকে রেকর্ড করে রেখেছে। এই পতনকে জঁ-ফ্রাঁসোয়া লিউটার্ড বলেছিলেন 'পোস্টমডার্ন কন্ডিশন', যেখানে মানুষ বড় বড় বুলি বা 'মেটানারেটিভ'-এর ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। হেনরি হিলের জগতে অনেক কিছু ধ্বংস হয়েছে, তবে সবার আগে ধ্বংস হয়েছে আমেরিকান ড্রিমের সেই পুরনো বিশ্বাস। হেনরির কাছে তার বাবা কোনো আদর্শ মানুষ ছিলেন না, যদিও তার বাবা আইন মেনে চলতেন, পরিশ্রম করতেন আর সন্তানদের মানুষ করতে চাইতেন। তার চোখে বাবা ছিলেন সেই আধুনিক রূপকথার একজন বলির পাঁঠা মাত্র, কারণ পরিশ্রম করেও তার বাবা কিছুই পাননি। উল্টো পাশের গলির গ্যাংস্টার বা 'ওয়াইজ গাইজ'রা ছিল তার কাছে আসল হিরো। হেনরি বুঝেছিল, এই ব্যবস্থায় সফল হতে হলে আইনের পথে বাউলি মেরে বেআইনের পথে যাওয়াই একমাত্র গন্তব্য। সে সামাজিক চুক্তি - শ্রদ্ধাবোধের বদলে ভয় আর ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই নিজের জীবন সাজাতে চাইল।
স্কোরসেজির এই ময়নাতদন্ত দেখায় যে, আমেরিকান ড্রিম এখন জঁ বোদরিয়ারের ভাষায় একটি "সিমুলাক্রাম"। অর্থাৎ এমন একটা নকল জিনিস যার পেছনে কোনো আসল সত্য নেই। হেনরি হিল কেবল টাকা বা অপরাধের জন্য গ্যাংস্টার হতে চায়নি। হ্যাঁ, সে টাকা চেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চেয়েছিল সেই গ্যাংস্টার জীবনের জৌলুস বা 'অ্যাস্থেটিক'। কোপাকাবানা ক্লাবের সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি হলো এই 'হাইপার-রিয়েলিটি'র সিনেমাটিক রূপ। হেনরি কেবল একটা ক্লাবে ঢুকছে না, সে তার ক্ষমতার উৎসব পালন করছে। তার জন্য সামনের সারির ভিআইপি টেবিলটি ছিল সফলতার একটা চিহ্ন, যা তার আসল পরিচয়ের চেয়েও তার "বিশেষ একজন হওয়া"র ইমেজটাকে বড় করে দেখায়। এই পৃথিবীতে আমেরিকান ড্রিম আর জীবন গড়ার পথ নয়, ওটা কেবল 'স্পেক্টাকল'- পথ এখন দেখনাদারির। বোদরিয়ারের মতে, এখন ছবির বা ইমেজের দাম বাস্তবের চেয়েও বেশি। হেনরির কাছে তার দামী স্যুট আর ক্লাবের টেবিল তার কাজের রেজাল্ট ছিল না, ওগুলোই ছিল তার আসল কাজ। রাষ্ট্রপতিরা আজও 'আইনের শাসনের' বড় বড় ভাষণ দেন, কিন্তু স্কোরসেজি দেখিয়েছেন যে আমেরিকা আসলে স্বার্থপর একদল মানুষের ভাঙাচোরা সমষ্টি। গুডফেলাস-এর মাফিয়াদের 'আমেরিকা বিরোধী' ভাবার কোনো কারণ নেই; বরং ওটাই আমেরিকান পুঁজিবাদের সবচেয়ে নগ্ন এবং সৎ রূপ। কিন্তু আমেরিকান ড্রিমের নয়া সংস্করণ এই গ্যাংস্টার ড্রিমটিও শেষ পর্যন্ত টিকেনি। লুফথানসা ডাকাতির পর তাদের সেই তথাকথিত 'পরিবার' ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। জিমি, যাকে সবাই ভালোবাসত, সকলের প্রিয়জন সেই জিমি-ই একে একে নিজের সঙ্গীদের খুন করতে শুরু করে যাতে টাকার ভাগ দিতে না হয়। এটা কেবল জিমি নয়, এটাই আমেরিকা- যেখানে ব্যক্তিগত লোভের জন্য মানুষ সব পুরনো বিশ্বাস বা আদর্শ বিসর্জন দিয়েছে। কার্ল মার্ক্স যেমন বলেছিলেন: "টাকা... বিশ্বস্ততাকে বিশ্বাসঘাতকতায়, ভালোবাসাকে ঘৃণায়, আর বুদ্ধিকে মূর্খতায় বদলে দেয়।" যেই আমেরিকান পুঁজিবাদ একসময় আমেরিকান ড্রিম তৈরি করেছিল, এখন সেই পুঁজিবাদই মানুষকে সমাজ থেকে এলিয়েনেটেড করে, চিরতরে মেরে ফেলছে আমেরিকান ড্রিমের আদর্শ। মানুষ এখন তার মানুষকে সহযোদ্ধা ভাবে না, পাশে তাকালে সে কেবল দেখে আরো এক প্রতিদ্বন্দ্বী এসেছে।
ফিল্মের শেষ দিকে চলে আসে, সব হারিয়ে জীবনের তাড়নায় রাজসাক্ষী হেনরি যখন একটা মফস্বলে 'উইটনেস প্রোটেকশন'-এ থাকে, তখন তাকে বাধ্য করা হয় সেই পুরনো "অফিসিয়াল" আমেরিকান ড্রিমের জীবন কাটাতে। পোস্ট মডার্নিটির চরম পরিহাস হলো এই, যে জীবনটাকে সে ঘৃণা করত, সেটাকেই তার জন্য শাস্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। স্কোরসেজি যেহেতু রাষ্ট্রপতির মতো মিথ্যা বলতে চান না, তাই হেনরি হিলের উত্থান পতনের দৃশ্যাবলি যখন আমাদের অন্তর্গত মনের ভেতর কথা বলছে তিনি ঠিক তখনই হেনরিকে দিয়ে ফোর্থ ওয়াল ভাঙান, হেনরি কথা বলতে শুরু করে আমাদেরই দিকে তাকিয়ে। মেনে নিতে বাধ্য করে, এই তথাকথিত "সুন্দর ও সাধারণ জীবন" আসলে কতটা বিরক্তিকর। সে অভিযোগ করে যে এখন তাকে একজন "নগণ্য সাধারণ মানুষের" মতো বাঁচতে হচ্ছে। সে বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু তার চোখে আমেরিকান ড্রিমের সেই বড় আদর্শটি অনেক আগেই মারা গেছে।
শেষ কথায় বলা যায়, 'গুডফেলাস' হলো একটা জাতির লালিত রূপকথার শেষ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট। আমেরিকান ড্রিম যে আসলে রাষ্ট্রের দেওয়া একটা ধোঁকা, একটা ভাওতাবাজি, সেটা স্কোরসেজি পুঁজিবাদের নৃশংস চেহারা দিয়ে প্রমাণ করেছেন। হেনরি হিলের শেষ কথাগুলো প্রমাণ করে যে আমেরিকা তার নিজের তৈরি করা আদর্শের প্রয়োজনীয়তা আজ নিজেই হারিয়ে ফেলেছে, পড়ে আছে কেবলই তার মৃতদেহ। একজন দক্ষ প্যাথলজিস্টের মতো স্কোরসেজি আমাদের সেই মৃতদেহটি দেখতে বাধ্য করেছেন, যা বলে দেয় যে বর্তমান বিশ্বে বাইরের চাকচিক্য আসলে ভেতরের আত্মাকে গিলে ফেলেছে বহু কাল আগেই।
তথ্যসূত্র
Baudrillard, Jean. Simulacra and Simulation. Translated by Sheila Faria Glaser, University of Michigan Press, 1994.
Gramsci, Antonio. Selections from the Prison Notebooks. Edited and translated by Quintin Hoare and Geoffrey Nowell Smith, International Publishers, 1971.
Lyotard, Jean-François. The Postmodern Condition: A Report on Knowledge. Translated by Geoff Bennington and Brian Massumi, University of Minnesota Press, 1984.
Marx, Karl. Economic and Philosophic Manuscripts of 1844. Translated by Martin Milligan, Prometheus Books, 1988.
Goodfellas. Directed by Martin Scorsese, performances by Ray Liotta, Robert De Niro, and Joe Pesci, Warner Bros., 1990.
Comments
Post a Comment