“I've known rivers:
I've known rivers ancient as the world and older than the
flow of human blood in human veins.
My soul has grown deep like the rivers.”
(Hughes, "The Negro Speaks of Rivers)
একটা নদীমাতৃক দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ হিসেবে ল্যাংস্টন হিউজের এই কবিতার সাথে আমি প্রায়ই নিজের একটা যোগসূত্র খুঁজে পাই। হিউজ তার জাতিগত পরিচয় বোঝাতে নদীর কথা টেনেছিলেন। ঠিক একইভাবে না হলেও, নিজের শেকড়ের কথা বলতে গেলে আমিও অনেকটা তার সুরেই বলতে পারি; কারণ আমার এলাকার সংস্কৃতি আসলে 'মেঘনা' নদীকে ঘিরেই আবর্তিত। এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স কোর্সে আমরা ‘ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস’ বা প্রকৃতি থেকে পাওয়া সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পড়ছিলাম। সেখানে যখন ‘সাংস্কৃতিক পরিষেবা’ (cultural services) অংশটা এল, তখন আমার সোশিওলিঙ্গুইস্টিকস কোর্সে শেখা একটা বিষয় মনে পড়ে গেল কীভাবে একটা নদী একটা জায়গার ভূগোল তো বটেই, এমনকি তার ভাষাকেও বদলে দিতে পারে। এই দুই কোর্সের শিক্ষা মিলিয়ে আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম: কোনো জায়গার পরিবেশ বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে যখন কোনো ভাষা বা উপভাষা নতুন রূপ পায়, সেটা আসলে প্রকৃতির দেওয়া একটা বড় সাংস্কৃতিক উপহার বা সার্ভিস। তখন মনে হলো মেঘনা নদী বাংলাদেশের নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাকে প্রভাবিত করেছে এবং পরিবেশের সাথে এর সম্পর্কটা ঠিক কোথায় এইটা একটু বোঝার চেষ্টা করে দেখি।
আমাদের ক্লাসের আলোচনায় আমরা দেখেছিলাম যে, নদী কেবল একটা ভৌত কাঠামো নয়, এর পেছনে রয়েছে বিশাল সাংস্কৃতিক প্রভাব। পরিবেশের এই দানগুলোই হলো ‘কালচারাল ইকোসিস্টেম সার্ভিস’। সোজা কথায়, প্রকৃতি থেকে পাওয়া সেই সব আধ্যাত্মিক বা অ-বস্তুগত সুখ-সুবিধা যা আমাদের মন ভালো রাখে বা আমাদের পরিচয় গড়ে দেয়। এর মধ্যে বিনোদন থেকে শুরু করে নন্দনতত্ত্ব কিংবা ধর্মীয় আবেগ- সবই থাকতে পারে। বাংলাদেশের অন্যতম বড় নদী মেঘনা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু পানি বা মাছের উৎস নয়, বরং একটা আবেগের নাম। এখানে এমন সব লোকগান, গল্প আর রূপক প্রচলিত যা কেবল জোয়ার-ভাটা, নদী ভাঙন বা পলিমাটি নিয়েই তৈরি; যা অন্য কোনো অঞ্চলের ভাষায় মেলা ভার। এমনকি আমাদের নোয়াখাইল্লা উপভাষাটি যেন এই নদীর তুফান আর ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তৈরি হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে মেঘনা। ভাষা বিজ্ঞানের ভাষায়, উপভাষা হলো একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের মুখের বুলি যা একই ভাষার অন্য এলাকার বুলি থেকে আলাদা। সময়ের সাথে সাথে এই পার্থক্যগুলো এতটাই প্রকট হয় যে এক সময় তারা আলাদা ভাষার সম্মানও পেয়ে যেতে পারে। উপকূলীয় এই এলাকায় ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর জলদস্যুদের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে গিয়ে মানুষের জীবনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করত। এই টিকে থাকার লড়াই আর খরস্রোতা নদীর দ্রুতবেগই মূলত নোয়াখাইল্লা ভাষাকে বাংলার এক শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র রূপ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
নদীর ধারের উর্বর জমি আর রুপালি ইলিশের টানে মানুষ এখানে নদীর ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। যত কষ্টই হোক, তারা এই মাটি ছাড়েনি বরং প্রকৃতির সাথে বুক মিলিয়ে লড়েছে। এই যে ঝড়-তুফানে একসাথে লড়াই করা কিংবা উত্তাল নদীতে মাছ ধরার সময় খুব দ্রুত একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করা- এসব কারণেই এই অঞ্চলের মানুষের কথা বলার গতি অনেক বেশি। এই দ্রুতগতির কারণেই অন্য এলাকার মানুষের কাছে এখানকার ভাষা কিছুটা শক্ত বা কর্কশ মনে হতে পারে। উত্তরবঙ্গের সাথে তুলনা করলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়। রাজশাহীর কথা ধরা যাক, সেখানকার পরিবেশ বা জীবন নোয়াখালীর মতো এত চ্যালেঞ্জিং ছিল না। তাই তাদের জীবন যেমন শান্ত, ভাষাও অনেকটা ধীরগতির। গতির পাশাপাশি নোয়াখাইল্লা ভাষার শব্দভাণ্ডারের একটা বড় অংশ সরাসরি মেঘনা নদী থেকেই উঠে এসেছে। নোয়াখালীর ভেতরেও এলাকাভেদে ভাষার কিছু পার্থক্য থাকলেও নদী-সংশ্লিষ্ট শব্দের ব্যবহার সবখানেই কমন, যা বাংলা ভাষার অন্য কোথাও সচরাচর পাওয়া যায় না। তাই বলাই যায়, এই ভাষার কারিগর খোদ মেঘনা নদী।
এই পুরো বিষয়টা নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমি বুঝলাম যে, ভাষা কোনো স্থির বিষয় নয়, বরং পরিবেশের কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা একটা জীবন্ত সত্তা। ভাষার ছাত্র হিসেবে এটা দেখে আমি অবাক হই যে কীভাবে একটা নদী আমাদের বাক্য গঠন, শব্দ বাছাই, এমনকি গলার স্বর বা উপমাকেও বদলে দিতে পারে। ভাষা আমার কাছে এখন একটা প্রাকৃতিক উপাদানের মতো মনে হয়, যা বন্যা আর তুফানের তালে তালে নিজেকে সাজিয়ে নেয়। এটাকে আমরা অনায়াসেই প্রকৃতির সাংস্কৃতিক পরিষেবা বলতে পারি, যা শেখায় যে প্রকৃতি আমাদের শুধু সম্পদই দেয় না, বরং বেঁচে থাকার মানেও শিখিয়ে দেয়।
মেঘনা নদীর এই প্রভাব বুঝতে গিয়ে আমার কাছে আদতে পুরো পরিবেশ রক্ষার ধারণাটাই বদলে গেছিলো। নদী বাঁচিয়ে রাখা মানে এখন শুধু মাছ বা জীববৈচিত্র্য রক্ষা নয়, বরং আমাদের হাজার বছরের গল্প আর ভাষাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। যদি নদীগুলো শুকিয়ে যায় বা দূষিত হয়ে পড়ে, তবে আমরা কেবল মাছ বা পানি হারাব না, হারিয়ে ফেলব আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর আত্মপরিচয়। সংগত কারণেই তা হারাতে চাই না। আর হারাতে না বলে, মেঘনার থেকে কোনভাবেই দূরে সরবো না আমি। মূলত মেঘনাই আমার পরিচয়।
তথ্যসূত্র:
Holmes, J. (2013). An introduction to sociolinguistics (4th ed.). Routledge.
Hughes, L. (1921, June). The Negro speaks of rivers. The Crisis.
Rasel, M. M. (2011). Phonological analysis of Chatkhil dialect in Noakhali District, Bangladesh. Theory and Practice in Language Studies, 1(9), 1051–1061.
Comments
Post a Comment