একজন মডার্নিস্টের মাজার দেখা: “শরীফ উদ্দিনের গান : ওরা এবং ‘অরা’” হেমায়েত উল্লাহ ইমনের প্রবন্ধের পাঠপ্রতিক্রিয়া
প্রাককথন: মাজার ব্যাপারটাকে ইদানীং কালে বাংলাদেশের প্রগ্রেসিভরা অনেকেই সেলিব্রেট করছেন সালাফিদের আগ্রাসনের এগেইন্সটে। আমার মডার্নিস্ট মন অবশ্য সালাফির জন্য যেমন মাজারের জন্যও তেমন। কারো প্রতিই এইখানে আগ্রহ নাই। কিন্তু এইখানে গুরুত্বপূর্ণ এই যে মাজার যখন ডমিন্যান্ট ছিলো তখন সে মানুষের উপর হামতাম করলেও, এখন সে ডমিন্যান্ট না; উলটো অন্যের ডোমিন্যান্সির স্বীকার। যেকারণে সেলিব্রেট না করলেও তার প্রতি আমার গ্রাজ নাই, বরং তার মানবাধিকার এর পক্ষেই অবস্থান নিবো। কিন্তু দেন এগেইন মাজারই আসল অন্যরা নকল এইসব বলে মাজারকে ওভারগ্লোরিফাই করার লাইনও আসলে আমার না। দিন শেষে দুইটাই প্রবলেমেটিক ইলেমেন্ট আমার রিডিং এ। মাজার তো কাল্টই, এই কাল্টের মহানতার তো কিছু নাই। দেশে আলাপ গুলো চিরকালই অস্তিত্ব রক্ষার নিরিখে হয় দুঃখজনক ভাবে। যেকারণে দেখা যায় পাড় নাস্তিকরা মাজারকে সহিহ ইসলাম বলে সেলিব্রিট করে সালাফিদের উৎপাতের বিপরীতে। যদিও মাজারের এখনকার ঢালাও নিরিহ রুপ তার ক্ষমতা হারানোর সাথে কানেক্টেড। ক্ষমতা থাকতে তার একাধিক রুপ ছিলো। কেউ ডোমিন্যান্ট কেউ এগ্রেসিভ। সেইখানেও আবার ওই সহিহ অসহিহ এর প্রসঙ্গ টানবেন সম্ভবত সুফিবাদীরা। আমি যেহেতু সুফিবাদী না, এই আলাপ আমার করার কথা না। এবং ভাব বাদের পুরো ব্যাপারটাকেই অস্বীকার করার কারণে আমি আসলে ঠিক রিলেট করতে পারি না মাজার সেলিব্রিট করে দেওয়া বেশিরভাগ আলাপ। পীরের মুজিজা নিয়ে আলাপগুলো আমার কাছে সাইন্টিফিকালি ইনভ্যালিড মনে হয়। মাজারের সাথে আমার সম্পর্কটা তাই স্রেফ ওর এক্সিস্ট করার লড়াইয়ের সাথে কানেক্টেড। ফিলোসফিকালি আমি চাই মাজারের কাল্ট প্র্যাকটিস সমাজ থেকে দূর হোক। কাল্টকে ভালো কোন কিছু বলে তো মনে হয় নাই কখনো। কিন্তু সেটা দূর হওয়াটা হতে হবে ফিলোসফিকাল পরিবর্তন এর মাধ্যমে। এবং সেই পরিবর্তন কোনভাবেই এগ্রেসিভ টোটালিটারিয়ান থিওক্র্যাট অক্ষরবাদে পরিবর্তন না। ওই পরিবর্তন এর পক্ষেও মানুষ আছে। কিন্তু মডার্নিটি এম্ব্রেইস করা সায়েন্টিফিক ওয়াল্ডের মানুষ বলে আমি পরিবর্তনটা অবশ্যই তাদের পথে চাই না স্বাভাবিক ভাবেই। সংকট হচ্ছে পরিবর্তনটা মডার্নিটির পথে হচ্ছে না। উলটো থিওক্র্যাট কর্তৃত্ববাদীরা তাদের অনুকূল পরিবর্তন নিয়ে আসার চেষ্টা করছে ভয়ভীতি ও আক্রমণ করার মাধ্যমে, এই আক্রমণের ভেতর আনএলাইভিং এর ঘটনাও ঘটতেছে। খুব সাম্প্রতিক ঘটনাই তো ঘটলো। যেইটা একি সাথে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের বিরুদ্ধে যায়, এবং ফিজিকাল এসল্ট। তাই মাজারের কাল্ট প্র্যাকটিস এর বিরুদ্ধে আমার অবস্থান নিয়েই আমি তার এক্সিস্ট করার লড়াইটারও পক্ষে। যেটা যেকোনো মানুষকে এসোল্ট করতে গেলে আক্রান্তের পক্ষে দাঁড়ানোর গ্রাউন্ড থেকে একদমই, কোনভাবেই মাজারকে সেলিব্রিট করার গ্রাউন্ড থেকে না। এই প্রাককথনের অবতারণা মূলত ইমনের লেখাটা নিয়ে আমার পাঠ অভিজ্ঞতার ন্যারেটিভ বোঝাতে। মাজারকে আমি থার্ড পার্সন হিসেবে দেখি, তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও, তার কাল্ট প্র্যাকটিসের সাথে নিজেকে রিলেট করি না। ইমনের লেখাটা পড়ার আগে এবং পরেও আমার মাজার প্রশ্নে অবস্থান একই রয়েছে। সেই অবস্থানে থেকেই ইমনের লেখাটাকে নিয়ে একটা লিটারারি এনালাইসিস লিখলাম। এই লেখার উদ্দেশ্য কোনভাবেই মাজার এবং মাজার কেন্দ্রিক কাল্ট প্র্যাকটিসকে গ্লোরিফাই করা নয়।
সেদিন এক ছোটভাইকে কথা প্রসঙ্গে বলছিলাম আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চর্চা গুলো রীতিমতো গানপয়েন্টের বিপরীতে দাঁড়ায়ে করতে হয়। মানুষ কথা বলে কারণ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। তখন দেখা যায় আমার মতো অনেকে রিলেট না করেও কথা বলে, আবার কেউ কেউ অস্তিত্বের স্বার্থে ওভারগ্লোরিফিকেশনকে সেলিব্রিট করার পথে চলে যায়। প্রসঙ্গত বলি, এই লেখায় আক্রমণকারীদের মব হিসাবে সম্বোধন করা হবে না, কারণ দেশব্যাপী মাজার, কুইয়ার, বামপন্থী, আদিবাসী এবং অন্য সমস্ত মানুষদের উপর বার বার একি মানুষেরাই যখন আক্রমণ করে এবং সেই মানুষরা একটা সংঘটিত গোষ্ঠী হিসেবেই পার্ফর্ম করে, যাদের নির্দিষ্ট (একাধিক) নামধারী প্ল্যাটফর্ম আছে, যাদের গোষ্ঠী পরিচয় আমরা জানি, উপর্যুপরি তাদের আক্রমণগুলোর পেছনে একটা নির্দিষ্ট কতৃত্ববাদী আইডিয়ার ডোমিন্যান্ট হওয়ার উদ্দেশ্য বিদ্যমান ; মব শব্দটা এইখানে ভয়ানক অনুপযোগী। বরং আল-কায়েদা আইসিস ইত্যাদি ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী এবং মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত রাজাকার বাহিনীর ভাব অনুসারীদের সংঘবদ্ধ থিওক্র্যাট এক্সট্রিমিজমই একে বলতে হয়। যাই হোক, এই ধরনের সংঘবদ্ধ আক্রমণ দীর্ঘদিন যাবতই মাজারগুলোর উপর বিদ্যমান এবং সেই আক্রমণ কেবল শারীরিক নয়, বরং তাত্ত্বিক ভাবেও মাজার এবং তার অনুসারীদের উৎখাত করার চেষ্টায় অবিরত ক্রিয়াশীল; এমন পরিস্থিতিতে আমি নিজে সেলিব্রিট না করলেও, যারা এর প্রতিক্রিয়ায় মাজার ধারার ইসলামকে সেলিব্রিট করছে তাদের পয়েন্ট অব ভিউটা আমি ধরতে পারছি। এইটা মূলত অস্তিত্বের প্রশ্নে নিপীড়িতের ঐক্য। তবে এই সমস্ত ঐক্যে সংকট থাকে এই যে নিপীড়িত পরবর্তীতে শক্তিশালী হলে দুর্বল অবস্থায় করতে না পারা পাওয়ার প্র্যাকটিস বেশ ভালো ভাবেই করে নেয়। মাজারের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনার কথা বলছি না, সম্ভাবনা দেখছিও না আসলে, তবু সংকটটা হয়ে যায় দুইটা জায়গায়। প্রথমত অতিআলাপ এবং অতিরঞ্জন, অতিরঞ্জন শব্দটা সঠিক হলো না বোধহয়- বলতে চাইছিলাম ওভারগ্লোরিফিকেশন। দেখা গেলো সকলেই মাজার নিয়ে কথা বলছে, এক্টিভিজমের কথা নয় তাত্ত্বিক কথা, কিংবা তাত্ত্বিক এক্টিভিজম। এবং সেই কাজ করতে গিয়ে মাজারকে ভয়াবহ ভাবে ওভারগ্লোরিফাইও করছে। তবে এর চেয়েও বেশি যেই বিষয়টা অধিক প্রবঞ্চনার ইঙ্গিত দিয়েছিলো মনে তা হলো এর মধ্যে কিছু কাজ দেখে কর্তার রিসার্চের ঘাটতি বাজেভাবে চোখে লেগেছিলো। যেমন বাবলি সরকারের সেই ভাইরাল গানটা, যা মূলত তার মৌলিক পালাগানের প্রারম্ভিকা, যেখানে তিনি মূলত বহু মকনুষের প্রতি তার গ্রেটফুলনেস প্রকাশ করেন; সেই গানটাকেই একটা ভিডিও কন্টেন্টে বলা হলো শরিফ উদ্দিনের কাটাকেল্লা এলবামের গান। কন্টেন্টটা মূলত কাটাকেল্লাকে নিয়েই ছিলো তাই কন্টেন্টের বাকি অংশে এই ভুলের প্রভাত সেভাবে ছিলো না। কিন্তু কন্টেন্টের শুরুটাই যেহেতু এই গান এবং এর ইতিহাস ব্যাখা করে হয়েছে এবং বাকি কন্টেন্টের সুতোটা এই গানই ছিলো তাই এই ভুলটা খুব একটা নিরিহ নয়। একটা পালা গানের প্রারম্ভিকা যেখানে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পীর, পালাকার বাবলি সরকারের পিতা মাতা এবং এমনকি বিপক্ষের পালাকালের প্রতিও শ্রদ্ধাজানানো হয়েছে সেটাকে কেবল কাটা কেল্লা বন্দনার গান বলে ফেলাটা ভূল হিসেবে রীতিমতো হাস্যকর। সেই সাথে বাবলি সরকারের মৌলিক কাজকে অন্য কারো কাজ এবং বাবলি সরকার তা কাভার করেছেন বলা বাবলী সরকারের সাথে অন্যায় করাও বলা চলে। মজার ব্যাপার হলো এই প্রারম্ভিকার ভেতরই বাবলি সরকারের নাম এসেছে আমাদের লোকজ গানের একটা ট্রেডিশন অনুসরণ করেই, "আমার মাতা পিতা আদর করে ছোট্ট বাবলি বাবলি নামে কয়" উচ্চারণ করা গানকে বাবলি সরকারের মুখেই ভাইরাল হতে দেখার পর একে শরিফ উদ্দিনের গান বলা তখনই সম্ভব হয় যখন আদতে কন্টেন্ট নির্মাতা তার অলসতায় বাবলি সরকারের সেই গানটা একবার শোনারও প্রয়োজন বোধ না করে, সেখানে প্রথমে কাটাকেল্লা শব্দ শুনে ইউটিউব এ কাটাকেল্লা লিখে সার্চ করে প্রথমে শরিফ উদ্দিনের গান পেয়ে, এবং আবারো অলসতায় এই গানটিও শোনার প্রয়োজন বোধ না করে, শরিফ উদ্দিনের সেই একদমই ভিন্ন গানকেই বাবলি সরকারের গাওয়া গানের মূল গান বলে দিয়েছেন। কন্টেন্ট নির্মাতার এই ধরনের অলসতা শিল্পী হিসেবে বাবলী সরকারের প্রতি বেশ ভালো রকমেরই অন্যায়। এই ধরণের হাফ বেইকড হাফ হার্টেড হাফ রিসার্চড কাজ, সেই সাথে অতিরঞ্জন ও অতি কথনের বাড়াবাড়িতে মাজার নিয়ে এই ফাঁকে বেশ ভালো ভালো কিছু কাজ হলেও মাজার নিয়ে আরো একটা লেখা সামনে এলে পড়ার ব্যাপারে কিছুটা স্কেপ্টিক অবস্থাই তৈরি করে। এর মাঝেই এই লেখাটা ইমন ইনবক্সে দিলো। ইমনের লেখার প্রতি পুরোনো একটা বায়াসনেস ছিলোই, অর্থাৎ সে ভালো লেখে তা আমি জানি কিংবা তার লেখা আমার রুচিতে ভালো ঠেকে। তবু ইতিমধ্যেই মাজার নিয়ে এমন অসংখ্য লেখা ও কন্টেন্ট দেখা, উপরি হিসেবে মাজার নিয়ে আমার দেখা সর্বশেষ কন্টেন্টেই বাবলি সরকারের গানকে শরীফ উদ্দিনের গান বলার ঘটনার স্মৃতি বেশ টাটকা থাকায়- যখন দেখলাম ইমনের লেখাটা সেই শরিফ উদ্দিনকে নিয়েই তখন আসলে বেশ ভয়ে ভয়েই লিংকটা ওপেন করলাম।
তবে ভয়টা কেটে গেছে লেখাটা পড়তে শুরু করার পর। প্রথমত রাইটিং স্টাইলটা নিয়ে বলতে হয়। পার্সোনাল রিফ্লেকশনে লেখা। এই তরিকার কেতাবি নাম হলো autoethnography, যেখানে একাডেমিক পেপারে রাইটার গৎবাঁধা থার্ড পার্সন ভিউ থেকে বের হয়ে পার্সোনাল এক্সপিরিএন্স, স্টোরি বলার মাধ্যমে।লেখা আগান। আমার বেশ পছন্দের স্টাইল এটা। এতটাই যে ইদানীং বেশ কিছু একাডেমিক লেখায় এই জিনিস ব্লেন্ড করছি লেখার শুরুর অংশে। ডিস্কাশনকে বোরিং হয়ে ওঠা থেকে আঁটকাতে এই রাইটিং স্টাইলটা বেশ অনবদ্য। ইমনের লেখাটা যদিও কোন একাডেমিক রাইটিং না। কিন্তু ফরমাল রাইটিং তো অবশ্যই। ফরমাল রাইটিং আর একাডেমিক রাইটিং এ আদতে কোন তফাৎ নাই, একাডেমিতে আমরা ফরমাল রাইটিং টাই করি। এইসব জায়গায় কেবল টাইটেলগুলো আর এবস্ট্রাকট ইত্যাদি সেকশন গুলো থাকে না এইটুকুই তফাৎ। মূল বডি টেক্সট একি রকমই থাকে। তাই পড়তে শুরু করেই যখন নিজের পছন্দের রাইটিং স্টাইল পেলাম বাকি লেখাটা পড়ার একটা আগ্রহ তৈরি হলো। ইমন লেখাটা শুরু করলো শরিফ উদ্দিনের গায়ক হিসেবে দুইটা সত্ত্বার উল্লেখ করে। যেইটা।একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, কারণ ভান্ডারি গায়ক শরিফ উদ্দিনকে আমি চিনেছি অনেক পরে। শরিফ উদ্দিনকে আমি একটা লম্বা সময় ধরে জানতাম মডেল আরিফ খানের নাচানাচি সম্বলিত "একটা বুরখা পরা মেয়ে পাগল করেছে" কিংবা সালমান মুক্তাদির, সিয়াম আহমেদের টেলিফিল্মে ব্যবহার হওয়া "ও বন্ধু লাল গুলাপী, কই রইলা রে" ইত্যাদি চটুল গানের গায়ক হিসেবে। এই গান গুলো এখন পপ কালচারে সেভাবে নাই, কিংবা থাকলেও আমার এলগরিদমে আসে না এখন আর। প্রান্তিক মানুষের প্লেলিস্টে বোধহয় এখনো আছে গানগুলো। তবে আমাদের হাই টেস্টের বাবলে বহুদিনই অনুপস্থিত এই গানগুলো। কিন্তু, বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া হিসেবে ফেসবুকের জনপ্রিয়তার দ্বিতীয় ধাপের শুরুর দিকে এই গানগুলো একদিকে ফানি কন্টেন্ট হিসেবে আরেক দিকে পপুলার কন্টেন্ট হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিলো। দ্বিতীয় ধাপের প্রথম অংশ কথাটা।উল্লেখ করায় বলে রাখা ভালো, ফেসবুকের জনপ্রিয়তার প্রথম ধাপ হিসেবে আমরা গণজাগরণ মঞ্চের সময়টাকে ধরতে পারি। ২০১৪ পরবর্তী সময়টাকে দ্বিতীয় ধাপ ধরছি। যদিও প্রথম আর দ্বিতীয় ধাপের টাইমলাইন আসলে বেশ কাছাকাছি। তো আপনি চাইলে একে প্রথম ধাপের অংশও ভাবতে পারেন। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের সময়টা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপ্তি এবং সেই ব্যাপ্তির ভেতর আলোচনার বিষয় বস্তু এবং মঞ্চ স্তিমিত হয়ে আসা এবং সেই সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপ্তি বাড়া বিশেষত আমাদের মতো তৎকালীন টিনেজারদের বৃহৎ আকারে নিয়মিত হওয়াটা ২০১৪ পরবর্তী সময়কে আলাদা করছে। এর আগে আমরা কেউ কেউ যারা ফেসবুকে ছিলাম তারা সম্ভবত গণজাগরণ মঞ্চের সময়ের ফেসবুকের সাথে এই ২০১৪ পরবর্তী ফেসবুকের তফাৎ খেয়াল করতে পারবেন। যারা ছিলেন না, তাদের জন্য বলি- পলিটিকাল সিরিয়াস এবং সামহোয়্যারইন ব্লগ প্রভাবিত ফেসবুক থেকে বের হয়ে ফেসবুক তখন (উদয়ন রাজিবের থেকে ধার নিয়ে বলি) কমিক পার্লামেন্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করছে। ফেসবুক তখন হাসি মজার জায়গা হয়ে উঠলো সামহোয়্যারইন এর সিরিয়াসনেস থেকে বের হয়ে। এখন আমরা যাকে মিম বলি, সেই বস্তু তখনো এক্সিস্ট করে না। মিমকে তখন সবাই গণহারেই ডাকতো অন্য একটা নামে, তা হলো ট্রল। প্রচুর ট্রল পেজ, সেই সাথে লেইম জোক এসোসিয়েশন ইত্যাদি গ্রুপ তখন শুরু হয়। ট্রল কিংবা মিম সহ্য করতে না পেরে মারামারির ঘটনাগুলোও তখন বেশ ঘটতো আমাদের কলেজ পড়ুয়া টিনেজারদের মধ্যে। আবার তৎকালীন মিমারদের ( কিংবা তখনকার ভাষার ভঙ্গিতে বলতে চাইলে বলতে হয় ট্রলার, হাহাহা।) মধ্যেও পার্সোনাল বাউন্ডারি ইত্যাদি বোধ কম ছিলো, স্যাটায়ারের চেয়ে পার্সোনাল এট্যাকের দিকেই মনোযোগ বেশি থাকতো, উদ্দেশ্যটাও তেমনই ছিলো। তখনো রাজনৈতিক আয়োজনে পেনপটিকোনিক রাষ্ট্রের বাসিন্দা হওয়ার রিফ্লেক্স হিসেবে যে দুর্দান্ত স্যাটায়ারবোধ আমাদের পরবর্তীতে অনেকটা কালেক্টিভলি গড়ে উঠেছিলো সে ব্যাপারটা ঘটে নি। পেনোপটিকোন স্টেট কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র টোটালিটারিয়ান রিজিম, যে নামেই ডাকি না কেন, এমন ধরণের রাষ্ট্র বাস্তবতায় বসবাস করলে মত প্রকাশ করতে পারার অক্ষমতা থেকে চিরকালই নাগরিকদের মধ্যে জন্ম নেয় দুর্দান্ত রসবোধ। আমাদের দেশে সেই ব্যাপারটা তখনো গড়ে উঠে নাই। এর ক’ বছর পরে খানিকটা স্যাটায়ার ইত্যাদি করা শুরু হয়, এবং ওই সময়টাতেই ধীরে ধীরে বাংলাদেশে শর্ট বাট সিরিয়াস মেসেজ এবং একি সাথে কোয়ালিটি স্যাটায়ারের এক্সপ্রেশন হিসেবে পলিটিকাল মিমের যাত্রা শুরু হয় দার্শনিক মিমস, কমরেডস, ডাকসু মিমস এইসব পেজের সুত্র ধরে। সে হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশে পলিটিকাল মিমের পায়োনিয়রিং এর সাথে একদম সরাসরিই আমি কিংবা আমরা যুক্ত ছিলাম। তবে এই মিম মুভমেন্টকে আমরা আন্ডাগ্রাউন্ড মুভমেন্ট হিসেবেই নিয়েছিলাম এবং আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্টের রীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে (বলা ভালো শ্রদ্ধাশীল থাকাটা আমাদের রাষ্ট্র বাস্তবতায় প্রয়োজনীয়তাও ছিলো।) কিন্তু এসব অনেক পরের কথা। আমরা এই লেখায় যে সময়টার স্মৃতি চারণ করছি সেই ২০১৪-১৫-১৬ এর সময়টায় বাংলাদেশের ফেসবুকে এইসব উইটি পলিটিকাল পাঞ্চ, মিম, স্যাটায়ার উপস্থিত হয় নাই। ফেসবুকে তখন যেসব মিম এবং ফানি কন্টেন্ট দেখা যেতো এবং আমরা নিজেরাও যা সেই সময়ে করতাম সেগুলোকে যদি এখন এসে ক্যাটাগরাইজ করি তাহলে কোন যদি কিন্তু ছাড়া ফেলতে হবে ড্যাড জোকের ক্যাটাগরিতে। এই ড্যাড জোকের সময়টাতেই দেশের একটা অংশের মানুষের কাছে পপুলার কন্টেন্ট হিসেবে ছিলো শরিফ উদ্দিনের এই গানগুলো। এবং তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় (বিশেষত ইউটিউবে) প্রকাশ এবং প্রচারের থ্রুতে আমাদের বাবলগুলোতেও এসে পড়ে “একটা বুরখা পরা মেয়ে পাগল করেছে” নামের অদ্ভুত চটুল গান এবং সেই গানে বোরখা পরা মেয়েদের চারদিকে “মডেল আরিফ খান” নামক ব্যক্তির অদ্ভুতুড়ে নাচানাচি। আরো অনেকটা পরে বুঝতে পারি এই কন্টেন্টের ফেটিশাইজেশন এবং টিজিং কন্টেন্ট। কিন্তু তখন ওই গান ছিলো আমাদের কাছে কেবলই ক্রিঞ্জ। এবং ক্রিঞ্জ হিসেবেই ফানি। এই গানের ভিডিওর কাটপিস প্রচার দিয়ে বেশ হাসাহাসি হতো। ওই সময়ই @18 অলটাইম দোড়ের উপর নামে একটা টেলিফিল্ম আসে, সালমান মুক্তাদির সিয়াম আহমেদ অভিনয় করছিলেন। মিশু সাব্বিরও বোধহয় ছিলেন। আর ছিলেন এলেন শুভ্র। আরো পরে জানতে পারি এই টেলিফিল্মের নির্মাতা আদনান আল রাজীব এর ব্যাপারে। তখনো উনি আমার কাছে অপরিচিতই। তো সেই টেলিফিল্মে ব্যবহার হইলো শরীফ উদ্দিনের আরেক পপুলার গান “ও বন্ধু লাল গুলাপী কই রইলা রে” পাগলের কামড় খেয়ে দৌড় দেওয়ার ব্যকগ্রাউন্ডে এই গান তখন বেশ ভালোই ভাইরাল হইছিলো, এবং আবারো ফানি কন্টেন্ট হিসেবেই। তবে ক্রিঞ্জ হইলেও সোশ্যালি এলিট ক্লাস থেকে বিলং করা এক্টরদের ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজার কারণে এই গান আবার “বুরখা পরা মেয়ের” মতো অচ্ছুৎ ছিলো না। ক্রিঞ্জের বদলে ফানি হিসেবেই দেখা হইতো ওই সময় এই গানকে। যদিও এখন দাঁড়ায়ে ক্রিঞ্জই মনে হবে বরং সেই সময়ের এই সব চিন্তাটাকেই। তবে গান হিসেবে লাল গুলাপী ঠিক বুরখা পরা মেয়ের মতো প্রবলেমেটিক না। তখনকার বিবেচনার প্যাটার্ন ক্রিঞ্জ হলেও বুরখা পরা মেয়ে পাগল করার গানকে আমরা ফানি কন্টেন্ট হিসেবে দেখলেও গান হিসেবে গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত আমার সোশ্যাল ক্লাসের জায়গা থেকে সঠিক বলেই মনে হচ্ছে। তো যাই হোক, এই ছিলো বহু দিন আমার শরীফ উদ্দিন এক্সপিরিএন্স। এরও বহুদিন পর আমি জানতে পারি এই শরীফ উদ্দিনই আবার মাজারী তরিকার মানুষদের গানে বেশ একচ্ছত্র জনপ্রিয়তার অধিকারি। ইমনের লেখার প্রারম্ভিক প্রশ্ন পেরিয়ে যখন তার লেখায় প্রবেশ করলাম তখন দেখলাম ওই সব চটুল গান না। ইমন লিখছে এই মাজারের গানগুলো নিয়েই। শুরুতেই বললাম মাজারের সাথে আমি রিলেট করতে পারি না। রিলেট করার ভান করার অসততাটাও করতে কখনোই আগ্রহী না। এবং ঠিক এই কারণেই আমি বেশ প্রকট ভাবে ইমনের লেখাটার সাথে রিলেট করতে পারলাম। কেনো? এর উত্তর আপনি সবচেয়ে ভালো ভাবে জানবেন নিজেই তার লেখাটা বিস্তারিত পড়লে। তাতে লেখার ধরণটাকে এবং জার্নিটাকে এক্সপ্লোর করতে পারবেন শরীফ উদ্দিনের সাথে সাথে, তাই আমি অবশ্যই আপনাকে মূল লেখাটা পড়তে বলছি এবং অতি অবশ্যই আমার এই লেখার কমেন্ট বক্সে পিনড কমেন্ট হিসেবে ইমনের লেখাটার লিংক দিয়ে দেবো। যাই হোক যা বলছিলাম, মাজার সংশ্লিষ্ট লেখা নিয়ে দোনোমোনো থাকলেও পড়ামাত্রই কেনো রিলেট করলাম ইমনের লেখার সাথে? তার কারণ হলো ও প্রারম্ভিক প্রশ্নের পর লেখাটা শুরুই করছে তার মাজার সংক্রান্ত একটা জার্নির উল্লেখ করে যেই জার্নিটা আমার নিজেরও আছে। সেই জার্নি মাজারের মুরিদ হওয়ার জার্নি না। বরং আজীবনই থার্ড পার্সন হিসেবে মাজার, মাজারের ভক্ত মানুষ এবং মাজারের ভক্ত নন এমন মানুষদের দেখার জার্নি। ইমনের অঞ্চল এবং আমার অঞ্চল সাংস্কৃতিক ভাবে বেশ কাছাকাছি অঞ্চল। একি সংস্কৃতি বলছি না। দুই জায়গারই নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। এবং আমাকে প্রায়শই আমাদের নোয়াখালী অঞ্চলের ভাষা ও নদী নিয়ে আলাপ করতে দেখে অবশ্যই বুঝে যাওয়ার কথা বেশ একটা স্বতন্ত্র সংস্কৃতিই আমাদের আছে। তবু কাছাকাছি বলছি কারণ একান্ত আঞ্চলিক সংস্কৃতির বাইরে কিছু সংস্কৃতি গড়ে উঠে একটু বৃহৎ আঞ্চলিক আকারে। একি নদীর তীরের দুইটা অঞ্চল, যদিও ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় মেঘনা থাকলেও তাদের প্রধান নদীর নাম তিতাস, যা আবার মেঘনারই শাখা নদী। মজার ব্যাপার হলো এই শাখার শুরুও মেঘনায় শেষও মেঘনায়; অদ্বৈত মল্লবর্মণ বলেছিলেন "মেঘনার শান্ত মেয়ে"। তো এই অঞ্চল দু'টো আসলে মেঘনা অঞ্চলের কিছু কমন টেন্ডেন্সি বহুলাংশে ধারণ করে। ভায়োলেন্সের কথা আপনারা কম বেশি জানেন। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার ভায়োলেন্স বেশ ফেমাস এলিমেন্টই হয়ে উঠেছে ঢাকাই পপ কালচারে। একি রকম সুতীব্র ভায়োলেন্ট লড়াই কিংবা কিছু ক্ষেত্রে আরো ভয়াবহ ব্যাটেল দেখা যায় আমাদের নোয়াখালী লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে চর দখলের লড়াইয়ে; যেহেতু এইখানে মানুষ লড়াই করছে আশ্রয়ের সন্ধানে, অনেক বেশি ডেস্পারেট হয় মানুষ, বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের ঘটনা বলে সেভাবে সামনে আসে না। কিন্তু এই ভায়োলেন্ট টেন্ডেন্সির বাইরেও আরেকটা মিলের জায়গা আছে এই বড় অংশ জুড়ে। এই অঞ্চলে মাজারের মুরিদ এমন মানুষেরা আছে। কিন্তু তারা ঠিক সংখ্যাগুরু না। আবার সোশ্যাল মিডিয়া এবং ক্ষমতাকাঠামোয় শক্তিপ্রবাহের প্রদর্শনগত কারণে ঢাকায় বসে একটা ভ্রম অনেকেরই বোধহয় হয়, তা হলো কেবল দুইটাই স্ট্রিম বিদ্যমান একদিকে সুফি আরেক দিকে হলো সালাফি ওহাবি গোষ্ঠী যারা মাজার ভাঙা এবং পির ও মুরিদদের উপর শারিরীক আক্রমণ করে ও করার বাসনা রাখে। কিন্তু সত্যটা হলো কেবল এই দুই স্ট্রিম নয়, আরো স্ট্রিম আছে। দেশের বড় একটা সুন্নি মুসলিম জনগোষ্ঠী আছেন যারা পীরের মুরিদ নন, পীরের মুরিদদের যে কাল্ট প্র্যাকটিস তার প্রতি আক্রমণাত্মক না হলেও শ্রদ্ধাশীলও নন। কিন্তু একি সাথে তারা আবার ওই মাজারে যে পীর কবরে শায়িত তার প্রতি বেশ শ্রদ্ধাশীল। এবং পীর বিশেষে এই শ্রদ্ধা বেশ সুতীব্র রুপও নেয়। যেমন হজরত শাহপরান এবং প্রধানত হজরত শাহজালাল এর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। এই মানুষেরা পীরের কাছে মানত করেন না। কিন্তু পীরের মাজারে যান, কবর জেয়ারত করেন, একজন মহৎ মানুষের রওজায় যাওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাবার আশা করেন। পীরের মুরিদদের সাথে ইনাদের তফাৎ হলো ইনারা পীরের কাছে মানত করেন না, ইনারা আশা করেন একজন মহৎ ব্যক্তির কবর জেয়ারত করার ফলে তাদের জীবনে বরকত আসার সম্ভাবনা থাকলেও থাকতে পারে তবে সেটা পীর নয় আল্লাহর তরফ থেকে। কিন্তু এর চেয়েও বেশি যা কাজ করে তা হলো একজন মহৎ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন এমন একটা জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছা। ইনারা মাজারে শায়িত পীরদের মুরিদদের তরিকাকে সঠিক ভাবেন না। কিন্তু একি সাথে সেই পীরদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং হজরত শাহজালাল শাহপরাণ এমন প্রমিন্যান্ট পীরদের রওজায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রতিনিয়তই নিজ মনে ধারণ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ার ভ্রম এবং পলিটিকালি ইসলামিস্ট পাওয়ার প্র্যাকটিসে ইনারা অংশগ্রহণ না করার কারণে ঢাকায় বসে বুঝতে পারি না, কিন্তু ইসলামের এই স্ট্রিমটাই দেশের সংখ্যাগুরু অংশ। কিন্তু সংখ্যাগুরু হওয়াটা আপনি চাইলে উপলব্ধি করতে পারবেন নির্বাচনের সময়গুলোয়। হজরত শাহজালাল এর দরগায় কবর জেয়ারত এর পর অফিশিয়ালি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করা বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত রীতি। সর্বশেষ নির্বাচনেও বি এন পি খুব সম্ভবত এভাবেই শুরু করেছিলো। এইখানে ধরেন আপনি ওই সুফি ধারার মুরিদ নন কিন্তু পীরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনস্তত্ত্বও দেখতে পারেন আবার তা ছাপিয়ে দেখতে পারেন এই মনস্তত্ত্বের মানুষই এই দেশে সংখ্যাগুরু কিংবা এই ধারাটাই দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় হওয়ার ব্যাপারটা; যার এক্সপ্রেশন হিসেবেই আসে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগে হজরত শাহজালালের মাজার জেয়ারতের প্রসঙ্গ। যাই হোক, ইমনের লেখায় ফিরি। ইমন তার লেখাটা শুরু করে এমন একটা পরিবেশে তার বড় হওয়ার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে। মুরিদদের ভুল ভাবা আবার একি সাথে হজরত শাহজালাল এর মাজারে যাবার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ থাকা মানুষদের যে বাস্তবতার বর্ণনায় তার লেখা শুরু হয়েছে, সেই একি বাস্তবতাতেই আমিও বড় হয়েছি। তাই লেখার প্রথম প্যারাগ্রাফটাতেই আমি বেশ ভালোভাবেই রিলেট করতে পারি, যতই আমার জন্য আনরিলেটেবল টপিক নিয়ে লেখা হোক।
লেখার বাকি অনেকটা অংশে মূলত শরীফ উদ্দিনের গান এবং গানের ভিজুয়াল নিয়ে ইনফরমেটিভ এবং টেকনিক্যাল কথাবার্তা। কিন্তু এই কথাবার্তা গুলোতে ওভারগ্লোরিফিকেশন এর টোন ছিলো ছিলো না, ছিলো ইনফরমেশন দেওয়া এবং টেক্সট ও ভিজ্যুয়ালকে ডাইসেক্ট করে পাঠ করার প্রয়াশ। আগ বাড়িয়ে গরুকে গাছে তোলা গল্প না ফাঁদার জন্য এবং তেমন প্রচলিত গল্পগুলোকে লেখায় গুরুত্ব না দেবার জন্য একজন মডার্নিস্ট পাঠক হিসেবে আমার কাছ থেকে ইমনের একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য বলেই মনে হচ্ছে।
তবে এর ভেতরই আবার শরীফ উদ্দিনের ফ্যানবেজ বিষয়ক আলোচনায় রেমন্ড উইলিয়ামস এর কালচার এন্ড সোসাইটি (১৯৫৮) বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে ইমন বলছে স্ট্রাকচার অব ফিলিং এর কথা। এই প্রসঙ্গে সরাসরি ইমনের মূল লেখা থেকেই খানিকটা কোট করছি। “আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল পুরনো, প্রাতিষ্ঠানিক বা শ্রেণিভিত্তিক চেতনা নয়, তা বরং নির্দিষ্ট সময়ে এবং স্থানে মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে, এবং তার প্রতিনিধিত্বও করে। নির্দিষ্ট সময়কালের সামাজিক অবস্থা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে অনুভূতির পরিবর্তন এবং বিকাশকে বোঝায়। শরীফ বর্তমান সোসাইটির স্ট্রাকচার অব ফিলিংস, তার গান শুধু মাজারে সীমাবদ্ধ নেয়, সে হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের অনুভূতির প্রকাশ ও প্রতিনিধি। তাকে এইভাবে রিড করলে তার বিস্তৃত পরিসর ও পরিব্যাপ্তিটা বুঝতে পারি।” এই কথাটার গুরুত্ব ধরা যায় যখন আমরা দেখি শরীফ উদ্দিন তার ক্লাস এক্সিস্টেন্স কে কিছুমাত্রায় অতিক্রম করে মাল্টি ক্লাস এক্সিস্টেন্স তৈরি করে নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেই নেওয়াটা আসলে কতটা অরগানিক? এবং সকলেই কি একি ভাবে তার অডিয়েন্স হয়েছে? এই জায়গায় আমার ইমনের লেখার সাথে খানিকটা দ্বিমত তৈরি হয়েছে বলতে হয়। মাজারের ভক্ত, মুরিদ বা আশেকানদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ থাকলেও; এই ব্যাপারে দরগা থেকে দরগায় ভিন্নতা প্রায়শই দেখা যায়। উচ্চ শ্রেণির মানুষেরা সচরাচর সকল পীরের মুরিদ হন না। এবং এর চেয়েও জরুরী ব্যাপার হচ্ছে পীরের মুরিদদের প্রধান জনগোষ্ঠী মূলত তারা নন। বিশেষত শরীফ উদ্দিন যেসকল পীরের বন্দনা করে গান গেয়ে থাকেন তাদের মধ্যে এই ব্যাপারটা আরো কম। বরং প্রান্তিক মানুষেরাই বেশি। সাবঅল্টার্ন ক্লাসের বাইরে আপনি ল্যাংটা বাবার মুরিদ খুঁজে পাবেন না। মডার্নিস্ট মিডল ক্লাস কিংবা ঢাকাই এলিট ক্লাসের কাছে ল্যাংটা বাবা নামটা রীতিমতো হাস্যরসেরই বস্তু। যে ব্যাপারটা ইমনের নিজের লেখারই পরবর্তী অংশে থাকা ফানি কন্টেন্ট হওয়া যেমন “শরীফের বিখ্যাত গান ‘আইছি ল্যাংটা যামু ল্যাংটা’ গানে পিনাকীর চেহারা বসিয়ে ‘ফানি ভিডিয়ো’ বানান”, এমন পরিস্থিতিগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক। শরীফ উদ্দিনের মাজারের গান মাজারের ভক্তরা যেভাবে গ্রহণ করেছে বাকিরা সেইভাবে গ্রহণ কী করেছে? সম্ভবত না। এবং পরবর্তী প্রশ্ন, মাজারের ভক্তের বাহিরে বাকিরা এই গানগুলোকে গান হিসেবে প্রশ্ন করেছে কিনা; তার উত্তরও সম্ভবত না। তারা মূলত গান গুলোকে গ্রহণ করেছে কন্টেন্ট হিসেবে। এর বাহিরে আরো একটা অংশ শরীফ উদ্দিনের গান শুনে, যারা মিডল ক্লাস, এবং ফানি কন্টেন্ট হিসেবে শুনে না, মাজারের গান হিসেবেই শুনে; এদেরও একটা অংশের এই শোনাটা অনেকটা মাজারের গান শুনবো সিদ্ধান্ত নিয়ে শোনা যার সাথে ওই শুরুতে বলা মাজার প্রতিক্রিয়ার যোগ রয়েছে। তাদের শোনাগুলোকে তাই আমার মতামতে অর্গানিক লিসেন বলে মনে হয় না। বরঞ্চ মাজারের পক্ষে আছি বোঝাতে করা পার্ফর্মেটিভ টাস্কই বেশি মনে হয়। স্বভাবতই শরীফ উদ্দিনের এই মাল্টিক্লাস হওয়া প্রসঙ্গে ইমনের সাথে আমার দ্বিমত হয়, এবং চিন্তাভাবনা করে আমি আবারো নিজের সিদ্ধান্তেই থাকি যে শরীফ উদ্দিনের গানের শ্রোতা আদতে সাবঅল্টার্ন ক্লাসের মানুষেরাই, বাকিরা তার গান কেন্দ্রিক কন্টেন্টের ভিউয়ার বড়জোর। তাই আমার বিচার বলে শরীফ উদ্দিন নিজের শ্রেণি উত্তরিত হতে পারেন নাই। উনি মূলত সাবঅল্টার্ন ক্লাসেরই মিউজিশিয়ান।
ইতিমধ্যেই ইমনের লেখাটার রাইটিং স্টাইল নিয়ে বলেছি এই স্টাইলটা ফরমাল রাইটিং এ আমার সবচেয়ে পছন্দের স্টাইল। সেই স্টাইল সাথে ইমনের লেখা গাঁথবার গুনে, শ্রেণি প্রসঙ্গে দ্বিমত নিয়েই বাকিটা লেখাটা পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। বাকিটা পড়তে থাকি। দেখলাম পরবর্তীতে তাকে ফানি হিসেবে দেখার প্রসঙ্গে একটা প্যারাগ্রাফ এসেছে। ইমনের লেখা থেকে কোট করি আবারো-
“অর্থাৎ শরীফের গানকে মোট ৩টি জায়গায় বুঝতে পারি:
১. ভান্ডারি বা মরমি গানের ভক্তি বা আবেগ দিয়ে;
২. ‘লাল গোলাপি’, ‘বোরকা পরা মেয়ে’ মতো গানগুলো দিয়ে; এবং
৩. ‘ফানি’ হিসেবে”।
এই ৩ নম্বর পয়েন্টেই আমার গত প্যারাগ্রাফে দ্বিমতের গ্রাউন্ডটা ছিলো। আমার মত হচ্ছে যারা ফানি হিসেবে নিচ্ছে তারা গান নয় বরং কন্টেন্টের অডিয়েন্স। এবং সেই কন্টেন্টটা মিউজিকাল বা ভক্তিমূলক না। সেই কন্টেন্টটা ফানি। যাই হোক এই ব্যাপারটা ইমন এই প্যারাগ্রাফে খানিকটা এড্রেস করে। সাথে হাই লো কালচারের দ্বন্দ্বের ব্যাপারটাও এড্রেস করে। মাল্টিক্লাস হওয়ার সাথে এই দ্বন্দ্বের কথাটা খানিকটা কন্ট্রাডিক্টরি নয় কী? তবে যেই প্রসঙ্গে হাই লো কালচারের কথা আসলো সেইখান থেকে আবারো আমার লেখকের সাথে এগ্রি করা শুরু করতে হয়। ইমন এই খানে লিখছে “রেমন্ড উইলিয়ামসের মতে, হাই ও লো কালচারের দ্বন্দ্ব প্রাচীন। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই আমাদের কালচারাল বোঝাপড়া করতে হবে, গ্রহণ-বর্জনের রাজনীতি বুঝতে হবে। অর্থাৎ নারগিস, রিপন ভিডিয়ো এবং শরীফকে এই দ্বন্দ্ব ও রাজনীতির জায়গায় থেকে মূল্যায়ন করতে হবে। একের পর এক মাজারে হামলা-ভাংচুরের মতো ঘটনাগুলো ডমিন্যান্ট-কালচারের পলিটিক্স, আধিপত্য হিসেবে বোঝাপড়া করা জরুরি”। এই কথাটা গুরুত্বপূর্ণ, কালচারের দ্বন্দ্বের মধ্যেও বোঝাপড়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করা।
লেখার শেষ অংশে গিয়ে দেখা যায় শরীফ উদ্দিনের অরা প্রশ্নে কথা হচ্ছে। এই জায়গায় ওয়াল্টার বেঞ্জামিনকে রেফার করতেও দেখতে পাবেন। তবে এই সব ছাপিয়ে এই শেষ অংশটায় সবচেয়ে জরুরী হয়ে থাকে যে কথাটা তা হলো, “তারা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার চায় না, স্বীকৃতি চায় না। তাদের এখন সবচেয়ে বেশি দরকার নিরাপত্তা”। সারাদেশ ব্যাপি বিস্তৃত থাকা একটা জনগোষ্ঠী এবং তাদের মহাতারকাকে নিয়ে একটা ফিচারে সবচেয়ে জরুরী কথা যখন হয়ে পড়ে এই নিরাপত্তা পাবার আকাঙ্খা তখন পরিষ্কার হয়ে যায় একটা গোষ্ঠী হিসেবে মাজারপন্থী মানুষেরা এখন ঠিক কতটা ভালনারেবল এবং তাদের উপর আক্রমণকারী গোষ্ঠী ঠিক কতখানি ধারালো। আক্রমণকারীদের আমি কোনভাবেই “তৌহিদী মব” বলে পরিচয় এড়াবো না। এরা অবশ্যই চিহ্নিত সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী। এদের মব ডাকা বন্ধ করা এবং সঠিক পরিচয়ে এড্রেস করা জরুরী। স্রেফ মব বলে দিলে চিহ্নিত করার সুযোগটাই হারিয়ে যায়। ক্রমাগত অস্তিত্বের লড়াই করতে থাকা অঞ্চলে চিহ্নিত করা একটা প্রাথমিক প্রতিরোধ। এবং যখন এমন তীব্রভাবেই তারা আক্রমণ করে, তখন এই প্রাথমিক প্রতিরোধ সবারই করা প্রয়োজন; এমনকি আমার মতো সায়েন্টিফিকালি ও ফিলোসফিকালি মাজার বিরোধী মানুষদের জন্যও। ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন এবং তারও আগে স্রেফ বেঁচে থাকার অধিকার এই সমস্ত দ্বন্দ্বের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
Comments
Post a Comment