Skip to main content

একটি সিরিজ কবিতাঃ অন্ত থেকে করিমুদ্দির শেষকথা


১. অন্ত

অহন আন্ধার রাইত,
বেবাগডি বিজলি নদীর মইধ্যে চমকায়া উডে।
শ্যাষবার যহন খোয়াবে মরন দ্যাখসিলাম,
কী কইসিলা মনে আসে?
"অমন খোয়াব দেইখো না পরান,
অন্তর জইলা যায়।
এই জনম তোমার একার না"
তাইলে ক্যান গ্যালা মোরে ছাড়ি?

বানের জলায় ভাটি যহন ভাইসা যায়,
আচানক ভুত দেহার লাহান চমকায়া উডি।
য্যান মনে হয় তুমি ভাইসা আহো!
"এই জনম তোমার একার না"
মুঠি কইরা মোর জনম ডাও লইয়া গ্যালা!

আসমানে চান্দ সুরুজ আহে যায়,
দেইখা দেইখা বছরডাও চইলা যায়।
পাশের ঘরের রইস মিয়ায় কয়,
"বয়স তো পইড়া আসে
তুমি আরেকটা বিয়া করো মিয়া"
তারে ক্যামনে কই? "এই জনম তো মোর একার না"
বাদলায় যহন নদীত তুফান আহে,
মন চায় চিক্কুর পাইড়া কাইন্দা উডি!
"এই জনম তোমার একার না"
ক্যান আইলা না পরান আমার?

যে রাইত্তে গ্যালা,
চান্দের হর এরুমনি আসিল।
জোসনা দ্যাখনের শখ আসিল তোমার,
হাইসে বাইরে গ্যালি ঘর হতি।
পিসে গিয়া কই, "অত আল্লাদ করোনিকো,
সুখে মইরে যাই "
তেনায় সুখ ল্যাখে নি গো মোর,
তোমারে সাপে কাটিলো!
সোন্দর মুখটা তোমার ক্যামন হইয়া গ্যালো,
চুল গুলান ধইরা পইড়া রইলাম মাটিত।
বদ্দি আইলো, রাখতি পারলো না।

যহন কবরে নামাতিসিলাম তোমারে,
চোক্ষে বানের লাহান পানি আইতাসিলো।
কত্ত সময় কাইট্টা গ্যালো।
মনে হইতাসে ব্রহ্মপুত্রের বেবাকডি পানি য্যান শুকায়া গ্যাসে।
তুমি তো কইসিলা,
" এই জনম তোমার একার না"


২.অতঃপর


**
চাইতে চাইতে বেবাগ জল বইয়া গেসে পদ্মা মার,
বাপটাও বুড়া হইসে।
ওই আমাগো পর ঘরের পর ঘর,
আবুলের মা বুড়ি মইরা গেলো ধুম করি।
পোলাপানডি চোক্ষের পানি ফেলতেসিলো না গাইল দিতেসিলো,
ঠাওর করতি পারি নাই!
সেই জোস্নার রাইত,সেই তোমার আল্লাদ,
খালি পোড়াতিসিলো মনরে।
আহ! যদি মানা করতাম তোমারে।
কইতাম যদি- " এত রাইতে বাইরে যাওনের কী দরকার!"
পুরুষ মানুষ,একটু ঠাটবাট দেহানই যাইত।
তা না! গ্যালাম তোমার পিছে পিছে।
সেই যে চাঁন দেখতে গ্যালা, আর তো আইলা না।
দুধ সাদা অঙ্গ নীল হইয়া গেলো, তুমি তো আইলা না পরান!
**
রইস মিয়া এহন আর আহে না।
ঘটকেও কয় না - "মিয়া! এই মাইয়াডারে কিন্তুক দেখতেই হইব।"
অহন তারাও বুইঝা গেসে, 'এই জনম আমার একার না'
এই জনম খালি তোমার লাগি!
**
আইজ ম্যালাদিন পর দেখতি আইলাম,
রাগ কইরো না বউ।
মহাজনে বড় তাগাদা দেয় গো।
বেবাগ তার কারবার, হাতির লাহান তার পাওনা টাহা!
এ বারতে গুইনা গুইনা আধ মন ধান দিতি হবে।
গেলো বারের ট্যাহা নাকি অহনো বাকি!
এইদিক দিয়া আবার পোলাডা বড় হইতাসে।
কত সনে পড়সে এহন?
এক নিষুতি রাইতে জন্ম হইসিলো তার, পাঁচ কী সাত সন আগে!
আরে কও না ক্যান!
অরে তো ইশকুলে দিতি হবে!
মহাজনে খালি কয় -" চাষার ব্যাটার পড়ালেখায় কী কাম!
ধান কাটবি, লাংগল টানবি,
বয়স হইলে বাপ দাদার মত মাগি খুইজ্জা বিয়া কইরা নিবি।
ইশকুলে যাওয়ার এত শখ কেন ছোটলোকের?
এই সব ভদ্দর লোকের জিনিস, চাষাভুষার জন্য না! "
ওইটিতে আর ভুলচি নে! চাষা আমি, আমার বাপ চাষা, দাদা-পরদাদা চাষা।
মা পদ্মার জল রক্তে ভাসাইয়া সোনা তুলসি আমরা।
সব তো কাইড়াই নিসে মহাজন, বড় কত্তা, গোরা বাবু- যার যেমনে খুশি!
এই সন
গেলো সন
তার আগের সন
তারো আগের সন..
সেই দাদার আমলে -
কে জানি কইছিলো " প্রাণ থাইকতে এই সোনার ধান দিমু না আমি!"
তার পরেতে, সে কী অত্যাচার!
তারি বান্দি রাখলো ঘরের খুটির লগে,তারপর-
তার বউ বেটিরে...
সইতে পারে নাই।
ভাঙ্গা ডিঙ্গার মত চইলে গেসিল পদ্মার প্যাটে।
এই চলবো না, আর চলবো না!
আমি করিম চাষা, আমার বাপ চাষা, দাদা পরদাদা চাষা।
কিন্তুক পোলা আমার চাষা হইব না।
ইশকুল যাইবো, বাবুগো মত সবডি পাশ দিয়া গ্রামে আইবো।
তহন আর কেউ নিবার পারবো না আমাগো ধান!
হাসতাসো? পোলায় আমার সব বন্ধ করবো দেইখো।
দেইখোই না তুমি!
খালি এই বার ধানডি দিয়া দি। পরের বার জমিনের ধান সব আমার হইব।
পোলায় ইশকুলে যাইবো, তোমার কবরের মাটি বাধান হইবো।
আর উপরে লাগামু একখান নিমের গাছ!
হাসতাসো আবারো? গেল সনেও কইসিলাম?
এইবার হইবোই দেইখো, মহাজনের সব কজ্জ এইবার মিটায়া দিমু।
এইবার জমিনের ধান আমার হইব,পোলায় ইশকুলে যাইবো, তোমার কবরের মাটি বান্ধান হইব।
এইবার আর দুঃখ থাকবো না দেইখো!

৩.করিমুদ্দির শেষকথা

**
হ্যার পরে কাইটা গ্যালো কত গুলান রাইত,
মহাজনের কিস্তি তবু কেনরে ফুরায় নাই?
ধান গ্যালো, ভিটা গ্যালো, গ্যালো প্যাটের ভাত,
পরার কাপড় হারাই হারাই, কেমনে চলি বাপ?
প্যাদা আসি শাঁসায় গ্যালো ধরবে টুঁটি চিপি
ধানের কথা কইলে পরে মারবে গলা টিপি।

**
হুর হাট হুর হাট
মানবো না আর, মানবো না আর,
চাবুক গুলি ডরব না তার।
খাইতে চাই, পরতে চাই,
নিজের ধান নিজের চাই।
এই জমিনে গতর খাটি আমরা ধান বুনি,
কোন সে ব্যাটা আমার থিকা এবার লইবো কাড়ি!
জান নিবে বলে তারা, জান নিবে বলে,
জানের মায়া করি মোরা, এই কথা নি ভাবে?
খাইতে পায় না পোলায় বোয়ে, খাইতে পায় না মায়ে,
জানের মায়ায় বইসা এহন ক্যামনে মরদ থাকে?

**
"এহহে বড় বাড় বেড়েছে ছোটলোক গুলো,
এবার কী করি বলো তো কলিমুদ্দি? "
" হুজুর এত ভাবেন ক্যান? কথায় আছে না-
‘পাছাত নাই চাম, আদা কেষ্টর নাম৷’
চাষার ব্যাটা গুলা দুইদিন পরে যখন দানাটাও পাইবো না,
ঠিকই আপনার পায়ে আইসা পড়বো হুজুর"
"হা হা হা হা! এ তুমি বড়ো ভালো বলেছো হে।"

**
আরে আরে আরে আরে,
ঐ কোনাতে জটলা করি মেঘ ডাকিছে জোরে।
এহেহেহেহেহেহেহে,
জোরে চালাও কাস্তে বাহে, জোরে চালাও বাহে।
তুফান ডাকে ওই কোনাতে শুনছো নাকি ওরে?
আমার জমিন আমার গতর আমার গড়ায় ঘাম,
কেমনে তবে তুফান নিবে এমন সাধের ধান?
আইলো ওরে আইলো ওরে,আরো জোরে আরো
জোরে,
রক্ত জলা ধান এবার গোলায় তুলবো সবে।

**
হারেরেরেরেরেরে,
তুফান নারে তুফান নারে, আমরা এলাম ওরে।
বেশ করেছিস ধান কেটেছিস,
নেবো মেপে মেপে।

**
কই ওরে সব, কই ওরে সব?
প্যাদা এলো গাঁয়ে।
আছে যত কাস্তে কুড়াল সবটি বাহির কর।
ধান নিবে বলে মেপে, ধান নিবে বলে,
মুন্ডু ফেলার আগে তোরা পালা এখান থেকে।

**
মহাজনের লোক চইলা গ্যালো,
ধান নিতে পারে নাই এবার,
সবাই ফিরা গ্যাছে ঘরে।
আমি বইসা আছি নিম গাছের মতন,
তোমার কবরের পাড়ে।

এহন আন্ধার রাইত,
বেবাগডি বিজলি নদীর পানির মইধ্যে চমকায়া উডে!
x

Comments

Popular posts from this blog

একজন মডার্নিস্টের মাজার দেখা: “শরীফ উদ্দিনের গান : ওরা এবং ‘অরা’” হেমায়েত উল্লাহ ইমনের প্রবন্ধের পাঠপ্রতিক্রিয়া

প্রাককথন: মাজার ব্যাপারটাকে ইদানীং কালে  বাংলাদেশের প্রগ্রেসিভরা অনেকেই সেলিব্রেট করছেন সালাফিদের আগ্রাসনের এগেইন্সটে। আমার মডার্নিস্ট মন অবশ্য সালাফির জন্য যেমন মাজারের জন্যও তেমন। কারো প্রতিই এইখানে আগ্রহ নাই। কিন্তু এইখানে গুরুত্বপূর্ণ এই যে মাজার যখন ডমিন্যান্ট ছিলো তখন সে মানুষের উপর হামতাম করলেও, এখন সে ডমিন্যান্ট না; উলটো অন্যের ডোমিন্যান্সির স্বীকার। যেকারণে সেলিব্রেট না করলেও তার প্রতি আমার গ্রাজ নাই, বরং তার মানবাধিকার এর পক্ষেই অবস্থান নিবো। কিন্তু দেন এগেইন মাজারই আসল অন্যরা নকল এইসব বলে মাজারকে ওভারগ্লোরিফাই করার লাইনও আসলে আমার না। দিন শেষে দুইটাই প্রবলেমেটিক ইলেমেন্ট আমার রিডিং এ। মাজার তো কাল্টই, এই কাল্টের মহানতার তো কিছু নাই। দেশে আলাপ গুলো চিরকালই অস্তিত্ব রক্ষার নিরিখে হয় দুঃখজনক ভাবে। যেকারণে দেখা যায় পাড় নাস্তিকরা মাজারকে সহিহ ইসলাম বলে সেলিব্রিট করে সালাফিদের উৎপাতের বিপরীতে। যদিও মাজারের এখনকার ঢালাও নিরিহ রুপ তার ক্ষমতা হারানোর সাথে কানেক্টেড। ক্ষমতা থাকতে তার একাধিক রুপ ছিলো। কেউ ডোমিন্যান্ট কেউ এগ্রেসিভ। সেইখানেও আবার ওই সহিহ অসহিহ এর প্রসঙ্গ টানবেন সম্ভব...

মেঘনা: যে নদী এক ভাষার জন্ম দিছে

“I've known rivers: I've known rivers ancient as the world and older than the flow of human blood in human veins. My soul has grown deep like the rivers.” (Hughes, "The Negro Speaks of Rivers) একটা নদীমাতৃক দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ হিসেবে ল্যাংস্টন হিউজের এই কবিতার সাথে আমি প্রায়ই নিজের একটা যোগসূত্র খুঁজে পাই। হিউজ তার জাতিগত পরিচয় বোঝাতে নদীর কথা টেনেছিলেন। ঠিক একইভাবে না হলেও, নিজের শেকড়ের কথা বলতে গেলে আমিও অনেকটা তার সুরেই বলতে পারি; কারণ আমার এলাকার সংস্কৃতি আসলে 'মেঘনা' নদীকে ঘিরেই আবর্তিত। এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স কোর্সে আমরা ‘ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস’ বা প্রকৃতি থেকে পাওয়া সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পড়ছিলাম। সেখানে যখন ‘সাংস্কৃতিক পরিষেবা’ (cultural services) অংশটা এল, তখন আমার সোশিওলিঙ্গুইস্টিকস কোর্সে শেখা একটা বিষয় মনে পড়ে গেল কীভাবে একটা নদী একটা জায়গার ভূগোল তো বটেই, এমনকি তার ভাষাকেও বদলে দিতে পারে। এই দুই কোর্সের শিক্ষা মিলিয়ে আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম: কোনো জায়গার পরিবেশ বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে যখন কোনো ভাষা বা উপভাষা নতুন রূপ পায়, সেটা আসলে প্রকৃতির ...

সমুদ্রগামী রাজহাঁস, এবং তুমি

স্বর্গের নির্বোধ হুরপরীদের চাই নি বলে, আমি এক স্বেচ্ছা নিমজ্জিত রাজহাঁস- ডুবে যাই সমুদ্র জলে। একটি দ্বীপে, একটি উজ্জ্বল জ্বলজ্বলে দ্বীপে- তোমার বুক স্বর্গে ঢুকে পড়বার আগে- আমি মানুষ নই, এক বিজন শালিক তোমার বুকের তিলে ডুবে গিয়ে স্বর্গবাসী হই। ভূমধ্যসাগর থেকে গ্রিক রমণীর শখের ফিশবোলে যাতায়াতের মাঝে- একটা রঙিন মাছ তুলে দেখি উজ্জ্বল আকাশ। তোমার বুকের তারায় পুড়ে আমি স্বর্গবাসী হই। তবু আমি এক স্বেচ্ছাচারী রাজহাঁস, ডুবে যাই তোমার সমুদ্র চোখে। স্বর্গের নির্বোধ হুরপরীদের, এখন হাঙর ধরার মৌসুম।