স্কুলে পড়বার সময় আমার এক বন্ধু ছিলো,
পাড়ার দু' বাড়ি পরে একটা ছোট ঘরে থাকতো।
রাতভর ঘুটঘুটে অন্ধকারের পর ভোর হতেই
বেরিয়ে পড়তো থলে হাতে,
বলতো সূর্য কুড়োতে যাচ্ছে, তার বদ্ধ ঘরটায় প্রচন্ড অন্ধকার।
ভোর পেরিয়ে দুপুর হতো, বন্ধুও ফিরে আসতো
পা দু'টো জুড়ে শুধু ধুলো আর কাদার দলাই থাকতো।
তার আদমজীর মিলে তৈরি থলেটাতে সূর্য
ধরার স্বপ্ন-
সম্ভবত বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো মিলটার
মতোই।
ঘরময় তার প্রচন্ড অভাব, গ্লানি, ক্ষুধা,
বেকার বাবা, মা মাইনে পায় না তিন মাস।
কী এটা ওটা কাজ করে স্কুলের মাইনে
দিতো সে।
তখন সে সূর্য খুঁজতো কিনা জিজ্ঞেস
করা হয় নি,
তার হাতে তখন কী সব কাগজপত্রই দেখতাম
শুধু।
কলেজ কালে যখন ব্যস্ত ছিলাম
প্রেমিকার মান ভাঙ্গাতে
বন্ধু তখন হাতে করে এনেছিলো একটা
টকটকে লাল বই
বলেছিলো এখানটায় ঐ সূর্যটা রাখা আছে
পাড়ার মাঠে বাদাম চিবুতে চিবুতে
শুনেছিলাম তার কথা।
এক টাক মাথা দাড়িগোঁফ ওয়ালা লোকের
ছবি দেখিয়ে বলেছিলো,
"এই লোকটা সূর্য ধরতে
জানেন।"
তাকে এরপর অনেক দেখেছি, মিছিলে, সভায়, অবরোধে,
হাত তুলে স্লোগান দিতো-
"এই রাষ্ট্র মানুষ মারে, এই রাষ্ট্র ভেঙ্গে দাও"
তারপর অনেকদিন দেখি নি তাকে।
ইউনিভার্সিটি পাশ করে অনেকগুলো দিন
বেকার ঘোরার পর,
আমি সবে মাত্র একটা চাকরি পেয়েছিলাম
এই মফস্বলেই।
হঠাৎ একদিন তার সাথে দেখা।
ততদিনে অবশ্য জেনে গিয়েছিলাম ওই
টাকমাথা লোকটার নাম।
বন্ধু তখনো স্লোগান দিতো, আঙুল উঁচিয়ে বলতো -
"আমাদের অধিকার চাই, আমরা বাঁচতে চাই"
আমি বলেছিলাম একটা চাকরি খুঁজতে,
ও বড়ো অদ্ভুত ভাবে হেসেছিলো সেদিন।
বদলী হয়ে গেলাম আমি।
এর মাঝে আর খোঁজ পাই নি।
গতকাল তাকে দেখে এলাম,
দিব্যি ঘুমোচ্ছে, শুয়ে আছে তক্তার উপর।
ওর বুকটায় আমি সূর্য দেখেছিলাম, টকটকে লাল সূর্য।
সে এখন আর মিছিলে যায় না, সে এখন আর স্লোগান দেয় না।
রাষ্ট্র তার স্লোগানের মতো, তাকেও মেরে ফেলেছে।
সে আমার বন্ধু ছিলো,
গতকাল তার লাশ দেখে এলাম।
বুকে দু'টো গুলি নিয়ে পড়ে আছে তক্তার ওপর।
তার বুকে, আমি সূর্য দেখেছিলাম।
Comments
Post a Comment